বারিমণ্ডল ও বায়ুমণ্ডল

Estimated Reading Time: 22 Minutes

বারিমণ্ডল

ভূত্বকের যে নিচু এলাকা বা অংশগুলো পানি দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে তাকে বারিমন্ডল বলে। সাগর, মহাসাগর, উপসাগর, হ্রদ, নদী প্রভৃতি নিয়ে বারিমন্ডল গঠিত।

মহাসাগর

মহাসাগর

চারদিকে উন্মুক্ত জলরাশির বিশাল অঞ্চল হল মহাসাগর। মহাসাগরগুলো একত্রে পৃথিবীর ৭০.৯% ভূপৃষ্ট দখল করে আছে। পৃথিবীতে মহাসাগর ৫টি। যথা:

  • প্রশান্ত মহাসাগর
  • আটলান্টিক মহাসাগর
  • ভারত মহাসাগর
  • উত্তর/আর্কটিক মহাসাগর
  • দক্ষিণ/এন্টার্কটিক মহাসাগর

সবগুলো মহাসাগরই এক অপরের সাথে যুক্ত। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে মহাসাগর মাত্র একটি, কিন্তু ব্যবহারিক সুবিধার জন্য এগুলোকে ভৌগোলিক পূনর্বিভাজন করা হয়। মহাসাগরের যে অঞ্চলের গভীরতা ২০০ মিটারের বেশি তাকে উন্মুক্ত মহাসাগর বলে এবং যে অঞ্চলের গভীরতা সাধারণত ২০০ মিটারের কম, তাকে অবতটীয় অঞ্চল বা মহীসোপানিক অঞ্চল বলে।

সাগর

মহাসাগরগুলোকে আবার তুলনামুলক ক্ষুদ্র সাগরে বিভক্ত করা যায়। উল্লেখযোগ্য কিছু সাগর হল –

দক্ষিণ চীন সাগর
ক্যারিবিয়ান সাগর
ভূমধ্যসাগর
লোহিত সাগর
আরব সাগর
জাভা সাগর
জাপান সাগর
ওখটস্ক সাগর
কৃষ্ণ সাগর
এজিয়ান সাগর
আড্রিয়াটিক সাগর
উত্তর সাগর
বাল্টিক সাগর ইত্যাদি

আয়তনে বৃহত্তম সাগর হল দক্ষিণ চীন সাগর ও গভীরতম সাগর ক্যারিবিয়ান সাগর। সাধারণত সাগরের অংশবিশেষ ভূ-ভাগ দ্বারা আবদ্ধ থাকে। তবে সম্পূর্ণ ভূ-বেষ্টিত অভ্যন্তরীণ লবণাক্ত জলের বিশাল বিস্তৃতিকেও অনেক ক্ষেত্রে সাগর নামে আখ্যায়িত করা হয়। যেমন: ডেড সি, কাস্পিয়ান সাগর।

উপসাগর

উপসাগর (Bay) হল তিন দিকে স্থল দ্বারা বেষ্টিত একটি জলভাগ। উপসাগরের জল সাধারণত শান্ত হয়। বড় উপসাগরকে ইংরেজিতে গালফ (gulf) বলা হয় এবং অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকৃতির খাড়া পাড় বিশিষ্ট উপসাগর বা সমুদ্রের খাঁড়িগুলি ইংরেজিতে ফ্যোর্ড (fjord) নামেও পরিচিত। উল্লেখযোগ্য কিছু উপসাগর –

বঙ্গোপসাগর
পারস্য উপসাগর
মেক্সিকো উপসাগর
এডেন উপসাগর ইত্যাদি

মহীসোপান: স্থলভাগ সন্নিহিত সমুদ্রতলের অংশ যেখানে পানির গভীরতা সর্বোচ্চ ২০০ মিটার তাকে মহীসোপান বা Continental Shelf বলে।

মহাসাগর, সগর ও উপসাগরের সীমারেখা (সূত্র: উইকিপিডিয়া)

নদী

ভূপৃষ্টের উপর দিয়ে উচ্চ ভূমি থেকে নিম্ন ভূমির দিকে প্রবাহিত জলাধার যা সাধারণত কোন বিশাল জলাধার বা হ্রদ বা সমুদ্রে পতিত হয় তাই নদী। নদী সাধারণত উঁচু স্থান যেমন: পর্বত, হিমবাদ প্রভৃতি থেকে উৎপন্ন হয়। এসব উঁচু স্থানকে নদীর উৎস বলে। যেমন: গঙ্গা নদীর উৎস গঙ্গোত্রী নামক হিমবাহ। পৃথিবীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ নদী ও তাদের তথ্য নিম্নরূপ –

নদীঅবস্থানতথ্য
নীল নদআফ্রিকাবিশ্বের দীর্ঘতম নদ/নদী। এর দৈর্ঘ্য ৬, ৬৫০ কিলোমিটার। এটি উগান্ডার ভিক্টোরিয়া লেক থেকে উৎপন্ন হয়ে ভূমধ্যসাগরে গিয়ে মিশেছে। আফ্রিকার মোট ১১টি দেশের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়েছে নদীটি।
আমাজনযুক্তরাষ্ট্রপৃথিবীর বৃহত্তম ও দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। এটি আন্দিজ পর্বতমালার ব্রাজিল অংশের নেভাদো মিসমি নামক চূড়া থেকে উৎপন্ন হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়ে মিশেছে।
ইয়াংজিচীনএ নদীর অববাহিকার আয়তন চীনের মোট আয়তনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
মিসিসিপিযুক্তরাষ্ট্র
হোয়াংহোচীনচীনা শব্দ হোয়াং অর্থ হলুদ আর হো অর্থ নদী। নদীর হলুদ পানির কারণেই নদীটির নাম হোয়াংহো। এটি কুনলুন পর্বতের ছিহাই-তিব্বতি মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে পীত সাগরে পতিত হয়েছে। নদীটি ঘনঘন তার গতিপথ পরিবর্তন করে যা প্রচণ্ড দুর্দশার কারণ হয়। এজন্য হোয়াংহো নদীকে চীনের দুঃখ বলা হয়।
কঙ্গোপশ্চিম আফ্রিকা
ভলগারাশিয়াইউরোপের বৃহত্তম নদী। এটি রাশিয়ার ভলদাই পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে কাস্পিয়ান সাগরে পতিত হয়েছে।
ইয়াংসিকিয়াংচীনএশিয়ার দীর্ঘতম তদী। এটি তিব্বতের মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে হয়ে পূর্বচীন সাগরে পতিত হয়েছে।
জর্ডানজর্ডান, ফিলিস্তিন, ইসলাইলএটি ইহুদী ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পবিত্র নদী।
সিন্ধুএশিয়া, দক্ষিণ এশিয়াচীন, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এটি তিব্বতের মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে আরব সাগরে পতিত হয়েছে।

নদী সম্পর্কিত কিছু বিষয় –

নদীসঙ্গম: যেখানে দুই বা ততাধিক নদী মিলিত হয়।

মোহনা: নদী যেখানে কোন বড় জলাশয় (যেমন: হ্রদ) বা সাগরে মিলিত হয়।

দোয়াব: প্রবহমান দুটি নদীর মধ্যবর্তী ভূমি।

নদী উপত্যকা: যে খাতের মধ্য দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়।

উপনদী: যে নদী অন্য কোনো নদীতে গিয়ে মেশে।

শাখা নদী: যে নদী অন্য কোনো নদী থেকে সৃষ্টি হয়।

নদী অববাহিকা: যে বিস্তির্ণ অঞ্চল দিয়ে (শাখা-প্রশাখা সহ) নদীর পানি প্রবাহিত হয় তাকে নদী অববাহিকা বলে।

আরও দেখুন: বাংলাদেশের নদ-নদী, চড় ও দ্বীপ

হ্রদ

চারদিকে স্থল দ্বারা বেষ্টিত বৃহৎ জলরাশ্মিকে হ্রদ বলে। উপসাগরের সাথে হ্রদের পার্থক্য হল হ্রদ উপসাগর বা ছোট সাগরের মত কোন মহাসমুদ্রের সাথে সংযুক্ত থাকে না। ফলে এতে জোয়ার ভাটা হয় না। গুরুত্বপূর্ণ কিছু হ্রদ নিম্নরূপ –

হ্রদঅবস্থানতথ্য
কাস্পিয়ান সাগরইরান ও কাজাখস্তানএটি পৃথিবীর বৃহত্তম হ্রদ।
বৈকাল হ্রদরাশিয়াএটি পৃথিবীর গভীরত্তম হ্রদ।
সুপিরিয়র হ্রদযুক্তরাষ্ট্র, কানাডাস্বাদু পানির বৃহত্তম হ্রদ।
ভিক্টোরিয়া হ্রদআফ্রিকা (কেনিয়া, তানঞ্জানিয়া, উগান্ডা)আফ্রিকার বৃহত্তম হ্রদ।

জলপ্রপাত

উঁচু স্থান থেকে খাড়া বা লম্বভাবে নিপতিত জলরাশি হল জলপ্রপাত। বিশ্বের কিছু উল্লেখযোগ্য জলপ্রপাত –

জলপ্রপাতঅবস্থানতথ্য
নায়াগ্রাযুক্তরাষ্ট, কানাডাবৃহত্তম জলপ্রপাত। এর উচ্চতা ১৬৭ ফুট বা ৫১ মিটার।
ভিক্টোরিয়াজাম্বিয়া
অ্যাঞ্জেলভেনেজুয়েলাউচ্চতম জলপ্রপাত। এর উচ্চতা ৩২১২ ফুট বা ৯৭৯ মিটার।
ইগুয়াজিআর্জেন্টিনা

বায়ুমন্ডল

পৃথিবীর চারপাশ ঘিরে বিভিন্ন গ্যাস মিশ্রিত বায়ুআবরণকে বায়ুমন্ডল বলে। সমুদ্র সমতল থেকে বায়ুমণ্ডলের ঊর্ধসীমা ১০,০০০ কি. মি.। বায়ুমন্ডলকে পৃথিবী তার মধ্যাকর্ষণ শক্তি দ্বারা ধরে রাখেছে। পৃথিবীতে জীবনের আস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পেছেনে বায়ুমন্ডল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এটি সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি শোষণ করে এবং গ্রীনহাউস প্রক্রিয়ায় ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত রাখে। এছাড়া উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ ও প্রাণীর শ্বাস-প্রশ্বাসে বায়ুমন্ডলের উপাদানগুলো ব্যবহৃত হয়। বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের উপাদান (শতকরা) পরিমাণ-

  • নাইট্রোজেন – ৭৮.০৮%
  • অক্সিজেন – ২০.৯৪%
  • আর্গন – ০.৮%
  • জলীয় বাস্প – ০.৪১%
  • কার্বন-ডাই-অক্সাইড – ০.০৩%
  • নিয়ন – ০.০০১৮%
  • হিলিয়াম – ০.০০০৫%
  • ওজন – ০.০০০৫%
  • মিথেন- ০.০০০০২%
  • হাইড্রোজেন – ০.০০০০৫%
  • জেনন – ০.০০০০৯%
  • এবং অন্যান্য

বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতার হ্রাস-বৃদ্ধির ‌ওপর ভিত্তি করে বায়ুমণ্ডলকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা-

ট্রপোস্ফিয়ার
স্ট্রাটোস্ফিয়ার
থার্মোস্ফিয়ার
এক্সোস্ফিয়ার
ম্যাগনেটোস্ফিয়ার
বায়ুমণ্ডলের স্তর (সূত্র: মাধ্যমিক বই)

ট্রপোমণ্ডল (Troposphere)

ট্রপোস্ফিয়ার ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে কাছের বায়ুস্তর। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২ কি. মি. (নিরক্ষীয় অঞ্চলে ১৬-১৯ কি.মি এবং মেরু অঞ্চলে ৮ কি.মি.) পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। ট্রপোস্ফিয়ার মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় স্তর। ট্রপোস্ফিয়ারের ঊর্ধ্ব সীমায় অবস্থিত সরুস্থরকে ট্রপোপজ বলে। এখানে বিমান চলাচল করে থাকে। স্থলজ উদ্ভিদ ও স্থলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য উপযুক্ত বাতাস কেবল পৃথিবীর ট্রপোমণ্ডলই আছে।

ট্রপোমণ্ডল ভূপৃষ্ঠ কর্তৃক বিকিরিত তাপশক্তি দ্বারা সবচেয়ে বেশি উওপ্ত হয়। উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাপমাত্রা হ্রাস পেতে থাকে। মূলত সকল আবহাওয়ার ঊপাদান (মেঘ, বৃষ্টি, বজ্রপাত ইত্যাদি) ট্রপোমণ্ডলে হয়ে থাকে। ট্রপোবিরতি হচ্ছে ট্রপোমণ্ডল ও স্ট্রাটোমণ্ডলের মধ্যে সীমারেখা সরূপ।

স্ট্রাটোমণ্ডল (Stratosphere)

স্ট্রাটোমণ্ডল বায়ুমণ্ডলের দ্বিতীয় স্থর। এটি ট্রপোমণ্ডলের পর উপরের দিকে প্রায় ৫০ কি. মি. পর্য্ন্ত বিস্তৃত। অর্থ্যাৎ ট্রপোবিরতি থেকে উপরের দিকে প্রায় ৫০ কি.মি. পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। এর শীর্ষে বায়ুমন্ডলীয় চাপ সমুদ্র পৃষ্টের ১০০০ ভাগের এক। স্ট্রাটোমণ্ডলের ওজোন স্তর দ্বারা অতিবেগুনি রশ্মির বিকিরণ ও শোষণ সংঘটিত হয়। ফলে বায়ু মণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। প্রায ৫০ কি.মি. উচ্চতা থেকে পুনরায় তাপমাত্রা হ্রাস পেতে থাকে।

মেসোমণ্ডল (Mesosphere)

স্ট্রাটোমণ্ডলের পর থেকে প্রায় ৮০ কি.মি. উচ্চতা পর্যন্ত মেসোমণ্ডল। মেসোমণ্ডল বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে শীতলতম তাপমাত্রা ধারণ করে। এ স্তরের উপরে তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়া থেমে যায়। মহাকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে আগত উল্কাপিণ্ডগুলো এ স্তরে ধ্বংস হয়ে যায়।

তাপমণ্ডল (Thermosphere)

মেসোমণ্ডলের পর থেকে প্রায় ৫০০ কি.মি. তাপমণ্ডল। এর নিম্নাংশকে আয়নমণ্ডল বলে। মেসোমণ্ডলে তাপমাত্রা অতি দ্রুত হারে বৃদ্ধি পায়। ভূপৃষ্টথেকে পাঠানো বেতার তরঙ্গ এ স্তরে প্রতিফলিত হয়ে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসে।

এক্সোস্ফিমণ্ডল ও ম্যাগনেটোমণ্ডল

এ দুটি স্তরই বায়ুমণ্ডলের সর্বশেষ স্তর।

Leave a Reply